শেয়ার
করুন

ওয়েবসাইটি শেয়ার করুন

বাংলা ভাষার বিকাশ ও বাঙালি জাতিসত্তা

December 23

বাংলা ভাষার বিকাশ ও বাঙালি জাতিসত্তা

বাংলা ভাষা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন, সমৃদ্ধ ও বহুল ব্যবহৃত ভাষাগুলোর একটি। ভাষাবিদদের মতে, বাংলা ভাষার বিকাশের ইতিহাস প্রায় ১৩০০ বছর পুরনো। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত ইন্দো-আর্য ভাষা পরিবার থেকে উদ্ভূত এই ভাষা সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত ও অপভ্রংশের ধারাবাহিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান রূপ লাভ করেছে। বিশেষ করে মাগধী প্রাকৃত বাংলা ভাষার ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলা ভাষার আদি লিখিত নিদর্শন হিসেবে চর্যাপদকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের দ্বারা রচিত। চর্যাপদের ভাষায় প্রাচীন বাংলা, প্রাকৃত ও অপভ্রংশের মিশ্রণ লক্ষ করা যায়, যা বাংলা ভাষার প্রাথমিক গঠন ও ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।<br /><br />অষ্টম শতক থেকে বাংলায় রচিত সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডারের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা ধীরে ধীরে পরিপক্বতা লাভ করে এবং অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে এসে এটি তার বর্তমান রূপ পরিগ্রহণ করে। মধ্যযুগে বৈষ্ণব পদাবলি, মঙ্গলকাব্য ও অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে বাংলা ভাষা ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। এই সময় চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ও আলাওলের মতো কবিরা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। ঊনবিংশ শতকে বাংলা গদ্যের বিকাশ ঘটে এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের হাতে বাংলা ভাষা একটি সুসংগঠিত ও মানসম্মত রূপ পায়। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত করে তোলেন।<br /><br />বাংলা ভাষার নিজস্ব লিপি হলো বাংলা লিপি, যা ব্রাহ্মী লিপি থেকে উদ্ভূত। বর্তমানে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে ব্যবহৃত বাংলা ভাষার মধ্যে শব্দগত ও উচ্চারণগত সামান্য পার্থক্য থাকলেও ভাষার মৌলিক কাঠামো, ব্যাকরণ ও সাহিত্যিক ঐতিহ্য অভিন্ন। বাংলা ভাষা কেবল সাহিত্যচর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি বাঙালির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বাংলার নবজাগরণে, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে একসূত্রে গ্রন্থনে এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।<br /><br />১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পূর্ব বাংলায় সংঘটিত বাংলা ভাষা আন্দোলন বাংলা ভাষার ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে প্রতিবাদরত ছাত্ররা পুলিশের গুলিতে শহিদ হন। এই আত্মত্যাগ বাংলা ভাষার সঙ্গে বাঙালি জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক স্থাপন করে। ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ করে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ভাষা আন্দোলন একটি মৌলিক প্রেরণা হিসেবে কাজ করে।<br /><br />স্বাধীনতার পর ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সকল রাষ্ট্রীয় কাজে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। ভাষা শহিদদের ত্যাগ ও মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। আজ বাংলা ভাষা শুধু একটি ভাষা নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও সংগ্রামের প্রতীক। বাংলা ভাষার ইতিহাস জানা মানে বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক শেকড়, জাতীয় চেতনা ও রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসকে গভীরভাবে অনুধাবন করা—যা চাকরি ও ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।