শেয়ার
করুন

ওয়েবসাইটি শেয়ার করুন

ছিটমহল সমস্যা ও সমাধান: সীমান্তের জটিলতা থেকে মানবিক সমাধান

December 04

ছিটমহল সমস্যা ও সমাধান: সীমান্তের জটিলতা থেকে মানবিক সমাধান

বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত অঞ্চলে বহু বছর ধরে চলমান একটি অদ্ভুত ও জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা ছিল, যা পরিচিত ছিটমহল সমস্যা নামে। ছিটমহল এমন এক ধরনের ভূখণ্ড, যা ভৌগোলিকভাবে একটি দেশের অভ্যন্তরে অবস্থান করলেও রাজনৈতিকভাবে অন্য দেশের অধীনস্থ। ইতিহাসের নানা পর্যায়ে মোগল ও কুচবিহারের রাজাদের মধ্যে যুদ্ধ, জমি হস্তান্তর এবং চুক্তির মাধ্যমে এলোমেলোভাবে এসব খণ্ডিত জমি তৈরি হয়েছিল। ব্রিটিশ আমলেও এই অবস্থার কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর এই ছিটমহলগুলো সীমান্ত সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।<br /><br />দীর্ঘ সময় ধরে ছিটমহলের মানুষ ছিল অমানবিক বঞ্চনার শিকার। তারা নিজেদের দেশের ভেতর থেকেও কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিল। কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র, নাগরিক অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সেবা— কিছুই সেখানে পৌঁছাত না। ছিটমহলবাসীরা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে থাকা মানুষ হিসেবে জীবনের প্রতিটি ধাপে সমস্যার মুখোমুখি হতো। বিয়ে, জমি রেজিস্ট্রি, মামলা-মোকদ্দমা, ভোটাধিকার— সবই ছিল তাদের নাগালের বাইরে। যেন নিজের দেশের মাঝেই তারা পরবাসী। এই পরিস্থিতির অবসান ঘটে ২০১৫ সালে, যখন বাংলাদেশ ও ভারত দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে স্থলসীমা চুক্তি (Land Boundary Agreement - LBA) বাস্তবায়ন করে। এই ঐতিহাসিক চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ছিটমহল বিনিময় করে সীমানাকে স্থায়ী রূপ দেয়। ছিটমহলবাসীদেরও সুযোগ দেওয়া হয় তারা কোন দেশের নাগরিক হতে চান তা নির্বাচনের। চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর শতাব্দীর পুরোনো সমস্যা এক নতুন যুগে প্রবেশ করে এবং হাজারো মানুষের জীবনে আলো ফোটে।<br /><br />সমাধানের পর ছিটমহলগুলোতে শুরু হয় উন্নয়ন কার্যক্রম। বিদ্যুৎ, রাস্তা, পানি, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র— এসব সুবিধা প্রথমবারের মতো পৌঁছায়। নাগরিকত্ব পাওয়ার পর মানুষ ভোটাধিকার ও আইনি সুরক্ষা ফিরে পায়, যা বহুদিন তাদের জন্য কেবলই স্বপ্ন ছিল। একসময় যে অঞ্চলগুলো ছিল অনিশ্চয়তা ও অবহেলার প্রতীক, এখন সেগুলো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জনপদে পরিণত হচ্ছে। ছিটমহল সমস্যা শুধুমাত্র একটি সীমান্তগত ইস্যু ছিল না; এটি ছিল মানবাধিকারেরও বিষয়। সেই দিক থেকে ২০১৫ সালের এই সমাধান দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও মানবিক দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ফলেই দীর্ঘদিনের জটিলতা মুছে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে গেছে।