শেয়ার
করুন

ওয়েবসাইটি শেয়ার করুন

কারা পেলেন ২০২৬ সালের ইগ নোবেল

September 06

কারা পেলেন ২০২৬ সালের ইগ নোবেল

বিজ্ঞানের জগতে নোবেল পুরস্কার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতিগুলোর একটি। তবে এমন কিছু গবেষণাও রয়েছে, যেগুলো প্রথমে শুনলে অদ্ভুত বা মজার মনে হলেও এর পেছনে থাকে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান। এসব ব্যতিক্রমী গবেষণাকে স্বীকৃতি দিতে প্রতিবছর দেওয়া হয় ইগ নোবেল পুরস্কার (Ig Nobel Prize)। সাধারণত এমন গবেষণাকেই এ পুরস্কার দেওয়া হয়, যা মানুষকে প্রথমে হাসায় এবং পরে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।<br /><br />২০২৬ সালের ইগ নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে ৩ সেপ্টেম্বর সুইজারল্যান্ডের জুরিখে আয়োজিত অনুষ্ঠানে। এবার মোট ১০টি বিভাগে অদ্ভুত, কৌতূহলোদ্দীপক ও চিন্তাশীল গবেষণাকে পুরস্কৃত করা হয়েছে।<br /><br />চুম্বনের বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা<br />২০২৬ সালের বায়োমেকানিক্স ইগ নোবেল পেয়েছেন যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক Matilda Brindle, Catherine Talbot ও Stuart West। বিভিন্ন প্রাণীর চুম্বন বিশ্লেষণ করে তাঁরা চুম্বনের একটি তুলনামূলকভাবে নির্ভুল বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা দেওয়ার চেষ্টা করেন। গবেষণায় মানুষ ছাড়াও বিভিন্ন প্রাণীর মুখ ও ঠোঁটের যোগাযোগের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে।<br /><br />ধনী ব্যক্তির অনৈতিক আচরণ<br />অর্থনীতি বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন Paul Piff, Daniel Stancato, Stephane Cote, Rodolfo Mendoza-Denton ও Dacher Keltner। তাঁদের গবেষণায় সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে উচ্চ অবস্থানে থাকা মানুষের অনৈতিক আচরণের প্রবণতা নিয়ে প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। শিশুদের জন্য রাখা মিষ্টি নেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন আচরণ পর্যবেক্ষণ করে গবেষকেরা সামাজিক শ্রেণি ও নৈতিক আচরণের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন।<br /><br />তেলাপোকার দুধে এত শক্তি কেন?<br />শুনতে অবাক লাগলেও রসায়ন বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে তেলাপোকার দুধ নিয়ে গবেষণা। Sanchari Banerjee, Nathan Coussens, Francois-Xavier Gallat, Nitish Sathyanarayanan, Jandhyam Srikanth, Koichiro Yagi, James Gray, Stephen Tobe, Barbara Stay, Leonard Chavas ও Subramanian Ramaswamy এই পুরস্কার পান।<br /><br />গবেষণায় দেখা যায়, নির্দিষ্ট প্রজাতির জীবন্ত সন্তান জন্ম দেওয়া তেলাপোকার দুধজাত প্রোটিনে গরুর দুধের প্রোটিনের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি শক্তি থাকতে পারে। এই অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যই গবেষণাটিকে বিশেষভাবে আলোচিত করেছে।<br /><br />নাক ঝাড়ার বৈজ্ঞানিক গবেষণা<br />মেডিসিন বিভাগে মরণোত্তর পুরস্কার পেয়েছেন জাপানের গবেষক Tokuji Unno। ১৯৭৭ সালে তিনি নাক ঝাড়ার সময় বায়ুপ্রবাহ ও এর গতিবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। দৈনন্দিন জীবনের অত্যন্ত সাধারণ একটি কাজকে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করার জন্যই এবার তাঁর গবেষণা ইগ নোবেলের স্বীকৃতি পেয়েছে।<br /><br />সাপ কেন কামড়ায়?<br />জীববিজ্ঞান বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন Joao Miguel Alves-Nunes ও তাঁর সহগবেষকেরা। বিষধর সাপের শরীরের বিভিন্ন অংশে হালকা চাপ প্রয়োগ করে তাঁরা বোঝার চেষ্টা করেন, কোন ধরনের স্পর্শ বা পরিস্থিতিতে সাপ মানুষকে কামড়ানোর প্রবণতা দেখায়। গবেষণাটি সাপের প্রতিরক্ষামূলক আচরণ বোঝার একটি ব্যতিক্রমী প্রচেষ্টা।<br /><br />প্রস্রাবের ছিটা কমানোর প্রযুক্তি<br />পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন Randy Hurd, Zhao Pan, Tadd Truscott ও Kaveeshan Thurairajah। তাঁদের গবেষণার লক্ষ্য ছিল প্রস্রাবের সময় তরল ছিটকে পড়ার ঘটনা কমানোর উপায় খুঁজে বের করা। গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে এমন ইউরিনাল নকশায় সহায়ক হতে পারে, যেখানে ছিটকে পড়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।<br /><br />মশার মুখ দিয়ে থ্রিডি প্রিন্টিং<br />প্রযুক্তি বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে মশার শুঁড় বা proboscis ব্যবহার করে উচ্চ-নির্ভুলতার থ্রিডি প্রিন্টিং নোজল তৈরির গবেষণা। এই প্রযুক্তিকে necroprinting বলা হয়েছে। অস্বাভাবিক একটি প্রাকৃতিক কাঠামোকে প্রযুক্তিগত কাজে ব্যবহার করার সম্ভাবনাই গবেষণাটিকে বিশেষ করে তুলেছে।<br /><br />শিশুদের গন্ধ বনাম কিশোরদের গন্ধ<br />ফ্যাকশন বা ঘ্রাণবিষয়ক বিভাগে পুরস্কার পাওয়া গবেষণায় দেখা হয়েছে, বাবা-মায়ের কাছে শিশু ও কিশোরদের শরীরের গন্ধ কেমন অনুভূত হয়। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, বাবা-মায়ের কাছে শিশুর গন্ধ সাধারণত বেশি আকর্ষণীয় মনে হলেও কিশোরদের গন্ধ ততটা ভালো লাগে না।<br /><br />শত্রুকে অপছন্দ করার ক্ষেত্রে বন্ধুত্ব<br />শান্তি বিভাগে Jaimie Arona Krems, Rebecka Hahnel-Peeters, Laureon Merrie, Keelah Williams ও Daniel Sznycer পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁদের গবেষণায় দেখা হয়েছে, মানুষ এমন বন্ধুকে কতটা মূল্য দেয়, যে তাদের অপছন্দের ব্যক্তিদের প্রতিও বিরূপ মনোভাব পোষণ করে। অর্থাৎ, অভিন্ন শত্রু কখনো কখনো বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী করতে পারে কি না—গবেষণায় সেই প্রশ্নই অনুসন্ধান করা হয়েছে।<br /><br />মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে মাটিতে পুঁতে রাখা অন্তর্বাস<br />মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে Franz Bender, Marcel van der Heijden, Atlant Bieri ও Pia Viviani পেয়েছেন পুরস্কার। তাঁরা ২৫টির বেশি দেশে মোট ১,০০০ জোড়া তুলার অন্তর্বাস মাটিতে পুঁতে রেখে নির্দিষ্ট সময় পর সেগুলো তুলে পরীক্ষা করেন। কাপড় কত দ্রুত মাটিতে পচে যায়, তা বিশ্লেষণের মাধ্যমে মাটির জৈবিক কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করা হয়।<br /><br />ইগ নোবেলের গুরুত্ব<br />ইগ নোবেলকে শুধু হাস্যরসের পুরস্কার হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায় না। অদ্ভুত প্রশ্ন, দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ ঘটনা কিংবা প্রচলিত ধারণার বাইরে থাকা বিষয় নিয়েও যে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা সম্ভব—এই পুরস্কার সেটিই তুলে ধরে।<br /><br />২০২৬ সালের বিজয়ীদের গবেষণাগুলোও দেখিয়েছে, বিজ্ঞান সব সময় বড় ও জটিল প্রশ্ন দিয়েই শুরু হয় না। কখনো একটি চুম্বন, নাক ঝাড়া, তেলাপোকার দুধ, সাপের কামড় কিংবা মাটিতে পুঁতে রাখা অন্তর্বাসের মতো সাধারণ ও অদ্ভুত বিষয় থেকেও নতুন জ্ঞান সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণেই ইগ নোবেল বিজ্ঞানকে আরও কৌতূহলোদ্দীপক ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে তুলেছে।